মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েকদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় আলোচনায় অংশ নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা বর্তমানে নেই বলে জানিয়েছে ইরান, দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে।
ওয়াশিংটন থেকে এএফপি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার আলোচকদের পাকিস্তানে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়ার পর তেহরান এই অবস্থান জানায়।
ইরানি বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান নৌ অবরোধ একটি বড় অচলাবস্থার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন রোববার একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ অবরোধ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা একটি ইরানি জাহাজে গুলি চালিয়ে সেটি আটক করে।
তেহরান জানিয়েছে, তারা এর জবাব দেবে। তাসনিম বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, ইরানের জাহাজ আটক হওয়ার পর দেশটি মার্কিন সামরিক জাহাজগুলোর দিকে ড্রোন পাঠিয়েছে।
রোববার রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি ইরানি সূত্রের বরাতে জানায়, ‘ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার পরবর্তী দফায় অংশ নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা বর্তমানে নেই।’
এর আগে ফার্স ও তাসনিম বার্তা সংস্থা অজ্ঞাত সূত্রের বরাতে জানায়, ‘সামগ্রিক পরিবেশ খুব ইতিবাচক বলা যায় না’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহারকে আলোচনার পূর্বশর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানায়, অবরোধ এবং ওয়াশিংটনের ‘অযৌক্তিক ও অবাস্তব দাবির’ কারণে ‘এই পরিস্থিতিতে ফলপ্রসূ আলোচনার কোনো স্পষ্ট সম্ভাবনা নেই।’
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল- এই তিন পক্ষ বর্তমানে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের আকস্মিক হামলার মাধ্যমে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা সাময়িকভাবে থামাতে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হয়।
এ পর্যন্ত মাত্র এক দফা ২১ ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হয়, যা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়। তবে এরপর নতুন করে আলোচনা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছিল।
ট্রাম্প রোববার এক বার্তায় বলেন, ‘আমরা একটি খুবই ন্যায্য ও যুক্তিসংগত চুক্তির প্রস্তাব দিচ্ছি, আশা করি তারা তা গ্রহণ করবে।’ একই সঙ্গে তিনি চুক্তি না হলে ইরানের অবকাঠামোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও পুনর্ব্যক্ত করেন।
ইরানি জাহাজে মার্কিন হামলা
যুদ্ধের শুরুতেই হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় ট্রাম্পের ওপর চাপ তৈরি হয়, কারণ এটি বিশ্বে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।
প্রণালিটি খুলে দিতে ব্যর্থ হয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করে, যাতে তেহরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করা যায়।
রোববার ট্রাম্প জানান, ‘তৌস্কা’ নামের একটি ইরানি পতাকাবাহী জাহাজ অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করলে মার্কিন নৌবাহিনী সেটিকে থামাতে গুলি চালায় এবং জাহাজটি আটক করে।
তিনি বলেন, জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষে গুলি করে সেটিকে থামানো হয় এবং বর্তমানে মার্কিন মেরিন সদস্যরা জাহাজটির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। জাহাজটি পূর্বের অবৈধ কর্মকাণ্ডের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পরে ইরানের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ডের এক মুখপাত্র সতর্ক করে বলেন, ‘এই সশস্ত্র জলদস্যুতা ও মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে শিগগিরই যথাযথ প্রতিক্রিয়া জানানো হবে।’
তাসনিম বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, ‘তৌস্কা’ জাহাজে হামলা ও জব্দ করার পর ইরান মার্কিন সামরিক জাহাজগুলোর দিকে ড্রোন পাঠিয়েছে।
লেবাননে ইসরাইল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতির পর শুক্রবার ইরান সাময়িকভাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দিলেও যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ বজায় রাখায় পরদিনই তা আবার বন্ধ করে দেয়।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী সতর্ক করে জানিয়েছে, অনুমতি ছাড়া প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা ‘শত্রুর সঙ্গে সহযোগিতা’ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং সংশ্লিষ্ট জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই বলেন, এই অবরোধ যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন এবং ইরানি জনগণের বিরুদ্ধে অবৈধ সামষ্টিক শাস্তি।
শনিবার স্বল্প সময়ের জন্য প্রণালি খোলা থাকায় কিছু তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ চলাচল করলেও রোববার সকালে তা প্রায় সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
এর আগের দিন বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ইরানের গুলি ও হুমকির তিনটি ঘটনা প্রণালির ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি স্পষ্ট করে তোলে।
নিরাপত্তা জোরদার
পাকিস্তানে সম্ভাব্য আলোচনাকে কেন্দ্র করে রোববার ইসলামাবাদে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। শহরের বিভিন্ন সড়ক বন্ধ ও যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, পাশের শহর রাওয়ালপিন্ডিতেও একই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
- মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, তার আলোচক দল সোমবার সন্ধ্যায় ইসলামাবাদ পৌঁছবে। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স; সঙ্গে থাকবেন মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।P
আলোচনার একটি প্রধান ইস্যু হলো ইরানের প্রায় অস্ত্রমানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত।
ট্রাম্প শুক্রবার দাবি করেন, ইরান প্রায় ৪৪০ কিলোগ্রাম সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে সম্মত হয়েছে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই মজুত ‘কোথাও স্থানান্তর করা হবে না’ এবং যুক্তরাষ্ট্রকে তা হস্তান্তরের বিষয়টি আলোচনায় কখনোই ওঠেনি।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬ । ৯:১৪ অপরাহ্ণ