নিজস্ব প্রতিবেদক:
নামে ‘পবিত্র’ হলেও কর্মে তিনি যেন অনিয়ম ও দুর্নীতির এক ‘মহাগুরু’। তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম বিভাগ-৬ এর নির্বাহী প্রকৌশলী পবিত্র কুমার দাস। দরপত্রে জালিয়াতি, কাজ না করেই কোটি কোটি টাকার বিল উত্তোলন, বছরের পর বছর ঢাকায় প্রাইজপোস্টিং ধরে রাখা, অবৈধ অর্থ বিদেশে পাচার এবং একাধিক নারী কেলেঙ্কারিসহ নানা রোমহর্ষক অভিযোগ উঠেছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অথচ এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় বিভাগীয় তদন্ত ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ফাইলবন্দি হয়ে আছে তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অকেজো জেনারেটর, সিকিউরিটি লাইট, পাম্প মোটর এবং বিভিন্ন ওয়ার্ডের বৈদ্যুতিক তার সংস্কারের জন্য মোট ২২টি কার্যাদেশ দিয়েছিল গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তর।
হাসপাতালের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ৬ সদস্যের তদন্ত কমিটির সরেজমিন পরিদর্শন প্রতিবেদনে এক ভয়াবহ জালিয়াতি ধরা পড়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২২টি কাজের মধ্যে বাবর অ্যাসোসিয়েটস, অনিক কনসোর্টিয়ামসহ বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে দেওয়া ২১টি কাজের কোনো অস্তিত্বই মাঠে নেই। অথচ নির্বাহী প্রকৌশলী পবিত্র কুমার দাস এবং উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান রনির যোগসাজশে ভুয়া প্রত্যয়নপত্র দেখিয়ে বরাদ্দকৃত প্রায় ১০ কোটি টাকা তুলে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. মো. নিয়াতুজ্জামান বলেন, “আমাদের কমিটি সরেজমিন পরিদর্শনে ২১টি কাজ না হওয়ার প্রমাণ পেয়েছে। আমরা লিখিতভাবে বিষয়টি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। বিচারের দায়িত্ব তাদের।”
পবিত্র কুমার দাসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো ব্যাপক হারে অর্থ পাচার (মানি লন্ডারিং)। বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত বিপুল পরিমাণ অর্থ তিনি হুন্ডির মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পাচার করেছেন। ভারতের নিউমার্কেট এলাকায় তার একটি বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে বলেও অনুসন্ধানে জানা গেছে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডায় তার বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের গুঞ্জন রয়েছে।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য মতে, পবিত্র কুমারের বাবা একজন সাধারণ পান বিক্রেতা হলেও, প্রকৌশলী হওয়ার পর আলাদিনের চেরাগ হাতে পান তিনি। বর্তমানে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মালিবাগ, ধানমন্ডি এবং বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় তার পাঁচটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও বাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার ‘সপ্তক’ আবাসন কোম্পানির ফ্ল্যাটটির মূল্যই নূন্যতম ৩ কোটি টাকা। এছাড়া ঢাকা উদ্যানের পাশে তার একটি ছয়তলা ভবনের নির্মাণকাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
শুধু আর্থিক দুর্নীতিই নয়, পবিত্র কুমার দাসের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ। অধিদপ্তরের ই/এম শাখার উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ‘অন্তরা’ এবং এর আগে বরিশালে কর্মরত থাকাকালীন অফিস সহকারী সেজুতি বিশ্বাসের সঙ্গে তার অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি অধিদপ্তরে ওপেন সিক্রেট। এর আগে সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারকে একাধিকবার এসব ঝামেলা মেটাতে হয়েছিল। এছাড়া প্রায়ই গুলশান-বনানীর বিভিন্ন স্পা পার্লার এবং বারে তার নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে বলে গোপন অনুসন্ধানে জানা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণপূর্তের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “তার কিছুই হবে না, সে বিশেষ মহলের আশীর্বাদপুষ্ট।” দীর্ঘ প্রায় ৬ বছর একই বিভাগে থাকার সুবাদে ই/এম-৬ শাখাটিকে তিনি দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছেন। নির্দিষ্ট পারসেন্টেজ ও কমিশন ছাড়া কোনো ঠিকাদারকে কাজ দেন না তিনি। গণমাধ্যমকে ম্যানেজ করার জন্য তার নিজস্ব লোক রয়েছে এবং একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বদলি বাণিজ্য করে কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা।
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী জনাব মোঃ খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। অন্যদিকে, অভিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী পবিত্র কুমার দাসের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনিও ফোন ধরেননি। এমনকি তার দপ্তরে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি; অধস্তন কর্মচারীরা জানান, “স্যার মন্ত্রণালয়ে আছেন”। মূলত গণমাধ্যমের ফোন ও উপস্থিতি এড়াতেই তিনি কৌশলে অফিস ফাঁকি দেন বলে জানা গেছে।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬ । ১:২৯ অপরাহ্ণ