অদৃশ্য নেটওয়ার্ক ও ছায়া পার্টনারশিপ গণপূর্তের প্রকৌশলীদের সিন্ডিকেট বাণিজ্য

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ১২:২৪ অপরাহ্ণ

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন:

প্রথম পর্বে উঠে এসেছিল গণপূর্ত অধিদপ্তরের পাঁচ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে সরকারি চাকরি বিধি ভেঙে গোপনে ডেভেলপার ব্যবসায় নাম লেখানোর অভিযোগ। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দেওয়া নথিপত্রে কেবল ক্ষমতার অপব্যবহারের চিত্রই নয়, বরং সরকারি পদের আড়ালে এক শক্তিশালী স্বজনপ্রীতি ও ‘ছায়া পার্টনারশিপ’-এর খবর মিলেছে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আইনগত বাধা এড়াতে নিজেদের রক্তসম্পর্কিত স্বজন ও স্ত্রীদের সামনে রেখে পেছন থেকে শত কোটি টাকার রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন তাঁরা।

পরিবারের নামে ‘ছায়া ব্যবসা’: ফিউচার ড্রিম ও ডালাস ডেভেলপারস

আইনের হাত থেকে বাঁচতে সরাসরি নিজেদের নামে ব্যবসা না চালিয়ে পরিবারের সদস্যদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার জোরালো প্রমাণ মিলেছে দুদকে জমা হওয়া নথিতে।

মিজানুর রহমানের ফিউচার ড্রিম বিল্ডার্স: উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান নিজে পর্দার আড়ালে থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির হেড অব মার্কেটিং হিসেবে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন তাঁর নিজস্ব দুই ভাই। প্রচার-প্রচারণা থেকে শুরু করে মূল পরিচালন ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে মিজানুরের ইশারাতেই। মোহাম্মদপুরের ওয়াশপুর টাওয়ার, মিরপুরের গৈদারটেক, উত্তরা দিয়াবাড়ি এবং সাভার-নবীনগরে শাখা ছড়িয়ে এই সিন্ডিকেট শত কোটি টাকার প্ল্যান পাস, কনস্ট্রাকশন ও ফ্ল্যাট বিক্রির কার্যক্রম চালাচ্ছে।

আবুল বাসার-গুলনাহার দম্পতির ডালাস নেটওয়ার্ক: সহকারী প্রকৌশলী ই/এম আবুল বাসার ও তাঁর স্ত্রী গণপূর্তের সহকারী প্রকৌশলী ই/এম গুলনাহার—দুই সরকারি কর্মকর্তা মিলে গড়ে তুলেছেন অদৃশ্য প্রপার্টি সিন্ডিকেট। আবুল বাসার তাঁর সহোদর ভাই ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ-উল আলমের মাধ্যমে ‘ডালাস ডেভেলপারস অ্যান্ড প্রপার্টিজ লিমিটেড’ পরিচালনা করছেন। সরকারি পদের তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার দাপটে স্বজনদের মাধ্যমে ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন এই দম্পতি।

কল রেকর্ডিং ও কমিশন বাণিজ্য: আব্দুর রউফের ডাবল গেম

গত ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে দুদকের চেয়ারম্যান বরাবর জমা পড়া লিখিত অভিযোগে উপসহকারী প্রকৌশলী আব্দুর রউফের সরাসরি ফ্ল্যাট বেচাকেনায় জড়িত থাকার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ফিউচার ড্রিম বিল্ডার্সের ওয়াশপুর টাওয়ারের কার্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই নেটওয়ার্কে রউফ মোবাইল ফোনে কত তলার কোন ফ্ল্যাট কত দামে বিক্রি হবে—তার সরাসরি দরদাম করতেন বলে প্রমাণ মিলছে।

ফ্ল্যাট ব্যবসার পাশাপাশি সরকারি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় চরম জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে রউফের বিরুদ্ধে:

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ভ্যালুয়েশন জালিয়াতি: ঢাকা-আশুলিয়া ও আব্দুল্লাহপুর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এলাকার জমি ও ভবনের ভ্যালুয়েশন (মূল্যায়ন) কার্যক্রমে জালিয়াতি করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ পকেটে পুরেছেন তিনি।

পর্যটন এলাকার জমি ও পজিশন বাণিজ্য: সাভার গণপূর্তের আওতাধীন পর্যটন এলাকার আশপাশের সরকারি জমিতে অবৈধ দোকান ভাড়া দেওয়া এবং পজিশন বিক্রির মাধ্যমে কমিশন বাণিজ্যের মূল হোতাও এই রউফ।

স্বার্থের সংঘাত ও আইনি বাধ্যবাধকতা

‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’ অনুযায়ী, সরকারের স্পষ্ট অনুমতি ছাড়া কোনো কর্মচারী লাভজনক ব্যবসা বা বাণিজ্যে সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে যুক্ত হতে পারেন না। গণপূর্তের প্রকৌশলীরা যেখানে সরকারি ভবন নির্মাণকাজের বাজেট প্রাক্কলন, কাজের তদারকি ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকেন—সেখানে একই পদে থেকে ব্যক্তিগত ডেভেলপার ব্যবসা পরিচালনা করা স্পষ্ট ‘ইন্টারেস্ট অব কনফ্লিক্ট’ বা স্বার্থের চরম সংঘাত। সরকারি সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের এটি এক জ্বলন্ত উদাহরণ।

অভিযোগপত্রে প্রকৌশলী আব্দুর রউফসহ জড়িতদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, আয়ের উৎস, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ এবং আর্থিক যোগাযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের জোরালো দাবি জানানো হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, দুদকের নিরপেক্ষ অনুসন্ধানে থলের বিড়াল শতভাগ বেরিয়ে আসে নাকি অধরাই থেকে যায় এই সিন্ডিকেট।

প্রিন্ট করুন