নিজস্ব প্রতিবেদক:
গণপূর্ত অধিদপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলীদের পদায়ন ও বদলিতে সম্প্রতি চালু করা হয়েছে ‘লটারি পদ্ধতি’। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতের যুগান্তকারী পদক্ষেপ দাবি করা হলেও, এর কার্যকারিতা ও সততা নিয়ে উঠেছে গভীর প্রশ্ন। স্বজনপ্রীতি, অস্বচ্ছ ক্যাটাগরি নির্ধারণ এবং বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে লটারিকে ‘ম্যানিপুলেট’ করার গুরুতর অভিযোগ এনেছেন অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সাধারণ দৃষ্টিতে লটারি মানেই সম্পূর্ণ ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে এলোমেলোভাবে (Random selection) ফলাফল নির্ধারণ, যেখানে কারও মেধা, ইচ্ছা বা হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকে না। অথচ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ক্ষেত্রে এই বদলির আগে প্রকৌশলীদের বিভিন্ন ‘ক্যাটাগরি’তে বিভক্ত করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, কোন নিয়মে বা কী মানদণ্ডে এই ক্যাটাগরি করা হয়েছে, তার কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা বা গাইডলাইন প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ। এমনকি এই তালিকা আগে থেকে প্রকাশ না করায় প্রকৌশলীরা কেউই জানতেন না কার অবস্থান কোথায়।
প্রশাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগের ক্ষেত্রে যেভাবে ফিটলিস্ট তৈরি ও সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়, গণপূর্তের ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। অত্যন্ত গোপনীয়তায় তৈরি করা এই ক্যাটাগরিতে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ও আক্রোশের প্রতিফলন ঘটেছে বলে ভুক্তভোগীদের দাবি।
লটারির চূড়ান্ত ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে বেশ কিছু নাটকীয় অসঙ্গতি:
- ঘনিষ্ঠদের সুবিধাজনক পদায়ন: অধিদপ্তরের প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তারা তুলনামূলক ‘আকর্ষণীয়’ ও গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতেই স্থান পেয়েছেন। ঢাকা টু ঢাকা, সংস্থাপন থেকে শেরেবাংলা নগর কিংবা র্যাব থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো সুবিধাজনক বদলি যেন পূর্বপরিকল্পিত।
- সিনিয়রদের নির্বাসন: বিসিএস ২৪, ২৭ ও ২৮তম ব্যাচের জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের বড় অংশকেই পাঠানো হয়েছে দূরবর্তী ও প্রান্তিক জেলাগুলোতে। অভিযোগ রয়েছে, সিনিয়রদের দিয়ে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধা আসতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই তাঁদের দূরে সরানো হয়েছে।
- অনভিজ্ঞদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব: মাত্র কয়েক মাস আগে পদোন্নতি পাওয়া কিংবা চলতি দায়িত্বে থাকা একঝাঁক নবীন নির্বাহী প্রকৌশলীকে বসানো হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সব চেয়ারে। এত অল্প সময়ে তাঁদের এমন কী বিশেষ পারদর্শিতা মূল্যায়িত হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন খোদ অধিদপ্তরেই।
- দ্রুত প্রজ্ঞাপন ও মহড়ার অভিযোগ: লটারি শেষ হওয়ার পর অস্বাভাবিক দ্রুততায় বদলির আদেশ জারি করা হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, লটারির নামে কার্যত মহড়া চালিয়ে আগে থেকেই ফলাফল সাজিয়ে রাখা হয়েছিল এবং বদলির আদেশ আগেই টাইপ করা ছিল।
এদিকে অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোতে উঠেছে ঘুষ বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পছন্দসই বা লোভনীয় ‘A+’ ও ‘A’ ক্যাটাগরিতে নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কর্মকর্তাদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়েছে। বিশেষ করে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সুবিধাজনক ভূমিকা রাখতে পারেন—এমন বিতর্কিত ট্র্যাক রেকর্ডের অনুগত প্রকৌশলীরাই অগ্রাধিকার পেয়েছেন। এমনকি ঢাকায় পদায়ন নিশ্চিত হওয়া কর্মকর্তাদের লটারির আগেই ফোনে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছিল বলেও গুঞ্জন রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের সদিচ্ছাকে পুঁজি করে স্বচ্ছতার আবরণে এমন লটারি আসলে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করেছে। বর্তমান মন্ত্রীর অজান্তেই একটি দুর্নীতিবাজ চক্র এ ধরনের প্রক্রিয়া চালিয়ে মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিকভাবে বড় বিতর্কের হাতিয়ার হতে পারে।
সার্বিক পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ প্রকৌশলী ও সচেতন মহল দাবি তুলেছেন, প্রশ্নবিদ্ধ এই বদলি আদেশ অবিলম্বে স্থগিত করে একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়ার সত্যতা যাচাই এবং দায়ীদের চিহ্নিত না করা পর্যন্ত গণপূর্তের এই ‘লটারি বিতর্ক’ থামার কোনো লক্ষণ নেই।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ । ১২:৪৭ অপরাহ্ণ