আমুর আত্মীয় নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুম বিল্লাহর বিতর্কিত পোস্টিং: দুর্নীতির অভিযোগ সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ দফতরে বহাল

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ । ১:৩৭ অপরাহ্ণ

 

নিজস্ব প্রতিবেদক:

জুলাই অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলেও সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আমির হোসেন আমুর আত্মীয় প্রকৌশলী মাসুম বিল্লাহর প্রভাব কমেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও দুর্নীতির পাহাড় গড়ে তোলার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এর মতো সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ দফতরে নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে পোস্টিং পেয়েছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান জাদুঘর দেখভালের মতো স্পর্শকাতর দায়িত্ব যে বিভাগের ওপর ন্যস্ত, সেখানে এমন একজন বিতর্কিত কর্মকর্তার পদায়নে সংশ্লিষ্ট মহলে চরম ক্ষোভ ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, লটারির ক্যাটাগরির মানদণ্ডের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে এবং প্রায় তিন কোটি টাকা লেনদেনের বিনিময়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) সরোয়ার জাহান বিপ্লবের সহযোগিতায় তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বাগিয়ে নেন। এ সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের একটি গোপন ভিডিও প্রতিবেদকের সংগ্রহে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।

কোটা জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার:

অনুসন্ধানে জানা যায়, ৩৩তম বিশেষ বিসিএসে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা কোটা ব্যবহারের মাধ্যমে গণপূর্ত অধিদপ্তরে প্রবেশ করেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মাসুম বিল্লাহ। আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর সুপারিশে চাকরি জীবনের শুরুতেই গুরুত্বপূর্ণ নগর গণপূর্ত বিভাগে পোস্টিং পান। ২০১৬ সালে নগর গণপূর্ত বিভাগের স্টাফ অফিসার (সহকারী প্রকৌশলী) থাকাকালে টেন্ডার বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন তিনি। গোপালগঞ্জের এস এ এন্টারপ্রাইজসহ দলীয় ঠিকাদারদের ১ থেকে ২ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে কাজ পাইয়ে দিয়ে মাত্র তিন অর্থবছরে প্রায় দুই কোটি টাকা অবৈধভাবে উপার্জনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

পরবর্তীতে পদোন্নতি পেয়ে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) হিসেবে মিরপুর উপবিভাগ-২-এ দায়িত্ব পালনকালে পাইকপাড়া অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রকল্পে অগ্রিম বিল ছাড় ও জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেন। এরপর প্রভাব খাটিয়ে বদলি হন শের-ই-বাংলা নগর ৩নং উপবিভাগে, যেখানে পরোক্ষ ঠিকাদারি ও ঘুষ বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন।

দুদকের অনুসন্ধান ও রহস্যজনক ডাকাতি:

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে প্রকৌশলী মাসুম বিল্লাহ, তার ভাই শফিউল বসর ও স্ত্রী নাইমা আক্তার সুমার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

মাসুম বিল্লাহর গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠির রাজাপুরের কাঠিরপাড়া গ্রামের বাসিন্দারা জানান, সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগে তাদের পারিবারিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত সাধারণ—একটি ভাঙা টিনের ঘরে বসবাস করতেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলে মাসুম বিল্লাহর উত্থান ঘটে রূপকথার মতো।

গ্রামবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ অক্টোবর মাসুম বিল্লাহর গ্রামের বাড়িতে এক রহস্যজনক ডাকাতির ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের বিপুল পরিমাণ অর্থসহ আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ কোটি নগদ টাকা ও কয়েকশ ভরি স্বর্ণালংকার তাদের বাড়িতে গচ্ছিত ছিল, যা ডাকাত দল লুটে নেয়। তবে অর্থের বৈধ উৎস দেখাতে না পারার ভয়ে থানায় দায়ের করা এজাহারে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে মাত্র ৭ লাখ ৫৭ হাজার টাকা ও ১৩ ভরি স্বর্ণ উল্লেখ করা হয়।

বিক্ষোভ ও উত্তেজনার আশঙ্কা:

জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়েও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বহাল তবিয়তে থাকা এবং উল্টো গুরুত্বপূর্ণ সংবেদনশীল স্থানে পদায়ন পাওয়া নিয়ে গণপূর্তের বঞ্চিত কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বৈষম্যবিরোধী প্রকৌশলীদের একজন জানান, এমন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে স্পর্শকাতর দফতরে পুনর্বহাল করায় যেকোনো সময় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে, যার সম্পূর্ণ দায়ভার বর্তমান গণপূর্ত প্রশাসনকেই নিতে হবে।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুম বিল্লাহর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।

প্রিন্ট করুন