গণপূর্ত প্রকৌশলী তাবেদুন সিন্ডিকেটের কোটি টাকা লুটপাট (১ম পর্ব)

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ৯ মে, ২০২৬ । ৮:৫২ অপরাহ্ণ

 

 

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ফ্যাসিবাদের অন্যতম দোসর, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ ঢাকা ডিভিশন-১ এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী জোয়ারদার তাবেদুন নবীর বিরুদ্ধে মিরপুরে হাজার কোটি টাকার সরকারি জমি হরিলুটের ভয়ংকর অভিযোগ উঠেছে। মাত্র ছয় কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে মিরপুর সেকশন-৯ এর প্রায় ২০ একর সরকারি জমি ১৭টি বেসরকারি কোম্পানি ও ভূমিদস্যুর হাতে তুলে দিয়েছেন তিনি। বদলি হয়ে দায়িত্ব হস্তান্তর করার ঠিক আগের দিন, এক নজিরবিহীন জালিয়াতির মাধ্যমে পূর্বের সব নিষেধাজ্ঞা বাতিল করে এই ছাড়পত্র দেন তিনি।

 

আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই মহাসড়যন্ত্রের বিষয়টি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিগোচর হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হলেও, তাকে সাময়িক বরখাস্ত না করে দেওয়া হয়েছে নামমাত্র ‘তিরস্কারের’ শাস্তি! অদৃশ্য খুঁটির জোরে বহাল তবিয়তে থাকা এই প্রকৌশলীর কাণ্ডে এখন পথে বসার উপক্রম হয়েছে শত শত সাধারণ ফ্ল্যাট ক্রেতার।

 

বদলি হওয়ার আগের দিনের সেই ‘মহা-মিশন’

অনুসন্ধানে জানা যায়, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ ঢাকা ডিভিশন-১ এর মিরপুরস্থ হাউজিং এস্টেটের বাউনিয়া মৌজাস্থ ৯ নং সেকশনের স্বপ্ননগর-২ প্রকল্পের উত্তর পার্শ্ব সংলগ্ন জায়গাটি সরকারের গেজেটভুক্ত ও গৃহসংস্থান অধিদপ্তরের (বর্তমানে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ) নিজস্ব সম্পত্তি (এল, এ. কেস নম্বর-০৫/৭২-৭৩ ও ১৩/৫৯-৬০)।

 

আলোচ্য সি. এস. ৩১০১ থেকে ৩১২৮ পর্যন্ত বিভিন্ন দাগের প্রায় ২০.০১ একর জায়গাটি দীর্ঘদিন ধরে আলিনগর, হ্যাভিলি লিমিটেড, এ্যাসিউর, সাগুপ্তা হাউজিং, এন,এম, হাউজিং লিমিটেড, সানভিউ টাওয়ার্স, আরএকে-২ ও সিটি লাইফ প্রোপার্টিজসহ ১৭টি কোম্পানি ও ব্যক্তি অবৈধভাবে দখল করে রেখেছিল।

 

সরকারি এই জমি উদ্ধারে দীর্ঘদিন ধরে কঠোর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ ছিল। কিন্তু জোয়ারদার তাবেদুন নবী বদলি হওয়ার পর, দায়িত্বভার বুঝিয়ে দেওয়ার ঠিক আগের দিন অর্থাৎ গত ২০ আগস্ট ২০২৪ তারিখে এক অভিনব জালিয়াতির আশ্রয় নেন। হাউজিং ডিভিশন-১, ঢাকার স্মারক নং ৩০১৫-এর মাধ্যমে তিনি পূর্বের সকল নিষেধাজ্ঞা ও জারিকৃত পত্র বাতিল করে রাজউক চেয়ারম্যান, মিরপুর সার্কেলের এসি ল্যান্ড, রাজউকের অথরাইজড অফিসার ও পল্লবী-তেজগাঁওয়ের সাব-রেজিস্ট্রারকে নতুন ছাড়পত্র পাঠিয়ে দেন। অভিযোগ রয়েছে, এই ছাড়পত্র দেওয়ার বিনিময়ে ‘মহিউদ্দিন গং’ নামের একটি চক্রের কাছ থেকে নগদ ছয় কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণ করেন তাবেদুন নবী।

 

তার এই এক চিঠির ওপর ভর করে ভূমিদস্যুরা দেদারসে সরকারি জমি রেজিস্ট্রেশন ও নকশা পাসের সুযোগ পেয়ে যায়। বর্তমানেও জমিটি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই, ১৭টি কোম্পানি সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

 

মিরপুরের ‘অঘোষিত চেয়ারম্যান’ ও তার সিন্ডিকেট

তাবেদুন নবী নিজেকে সবসময় সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা সাইফুজ্জামান শিখরের আত্মীয় পরিচয় দিতেন। এই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তিনি দীর্ঘ তিন বছর আট মাস ঢাকা ডিভিশন-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং মিরপুরকে নিজের ব্যক্তিগত তালুকে পরিণত করেন।

 

এই দীর্ঘ সময়ে তিনি শেখ সোহেল রানা, ইমামুল, শাহারিয়ার জনি ও রাদিউজ্জামানদের নিয়ে একটি শক্তিশালী ‘লুটপাট সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলেন। মিরপুরের যেকোনো জমির নামজারি, প্লট বরাদ্দ, আবাসিক প্লটকে বাণিজ্যিকে রূপান্তর কিংবা বাণিজ্যিক প্লটকে শিল্প প্লটে রূপান্তরের মতো বড় বড় কাজ নিয়ন্ত্রণ করত এই চক্র। গৃহায়ণের চেয়ারম্যানরা নামমাত্র আসতেন আর যেতেন, কিন্তু মিরপুরের মূল ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন ‘অঘোষিত চেয়ারম্যান’ তাবেদুন নবী।

 

অফিসেই চলত অনৈতিক অবিচার

তাবেদুন নবীর এই সিন্ডিকেটে জড়িয়ে ছিল চরম নৈতিক অবক্ষয়ের গল্প। অভিযোগ রয়েছে, তাবেদুন নবীর ‘তানিয়া রহমান’ (পিতা: খন্দকার আব্দুস সামাদ, মাতা: সুফিয়া সামাদ) নামের এক বান্ধবী ছিলেন। তানিয়া রহমানের স্বামী নিজেই পাহারাদারের ভূমিকা পালন করে তাকে মিরপুর হাউজিং অফিসে নিয়ে আসতেন।

 

অফিস চলাকালীন তানিয়া রহমান ও জোয়ারদার তাবেদুন নবী নির্বাহী প্রকৌশলীর কক্ষে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একান্ত সময় কাটাতেন। ওই সময় সাধারণ মানুষ তো বটেই, অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রবেশাধিকারও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ থাকত। ফ্যাসিবাদের ভয়ে সে সময় কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি। এই অনৈতিক সম্পর্কের সুবাদে তানিয়া রহমান একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট বাগিয়ে নেন এবং মিরপুরে কোটি কোটি টাকার জমির দালালি ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যান।

 

সবাই যখন সাধু!

সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, স্বপ্ননগর-২ প্রকল্পের উত্তর দিকের সীমানা প্রাচীর দেওয়া নিয়ে অবৈধ দখলদারদের সুবিধার্থে সেগুনবাগিচায় তৎকালীন গৃহায়ণ চেয়ারম্যানের সভাকক্ষে একটি গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই বৈঠকে গৃহায়ণের আইন কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান, ঢাকা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, সদস্য (প্ল্যানিং) বিজয় কুমার মন্ডল এবং আওয়ামী পান্ডা শেখ সোহেল রানাসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।

 

অভিযোগ রয়েছে, ওই বৈঠকে সবার সম্মিলিত সিদ্ধান্তেই তাবেদুন নবীকে এই কুখ্যাত NOC বা ছাড়পত্র দেওয়ার সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছিল। তাবেদুন নবী একাই ৬ কোটি টাকা পাননি, বরং পুরো সিন্ডিকেটই এই লুটের ভাগ পেয়েছিল। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি ভিন্ন হওয়ায় এখন বাকিরা ‘সাধু’ সাজার চেষ্টা করছেন।

 

বর্তমান প্রশাসনের অসহায়ত্ব

সরকারি জমি উদ্ধারে বর্তমান প্রশাসন এখন চরম বিপাকে পড়েছে। এ বিষয়ে বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ কায়সার ইবনে সাঈখ বলেন,

 

“আমাদের লোকজন ওই সরকারি জমি উদ্ধার করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে দখলদারদের হামলার শিকার ও আহত হয়েছেন। আমরা মামলা করেছি। বিষয়টি জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের হেড অফিসকে অবহিত করে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে পরবর্তী নির্দেশনা চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। হেড অফিস থেকে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দিলে আমরা অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে পারব।”

 

সর্বস্বান্ত সাধারণ ক্রেতারা

তাবেদুন নবীর এই অভিনব জালিয়াতির কারণে এখন বলির পাঁঠা হয়েছেন শত শত সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ। যারা নিজেদের সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে স্বপ্ননগর-২ প্রকল্পের আশপাশে এসব বেসরকারি কোম্পানির ফ্ল্যাট কিনেছিলেন, তারা এখন চরম অনিশ্চয়তায়। নতুন করে রেজিস্ট্রেশন, নামজারি ও নকশা পাসের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসায় গ্রাহকদের টাকা ও ফ্ল্যাট দুটোই এখন আইনি মারপ্যাঁচে আটকে গেছে।

 

একজন সরকারি প্রকৌশলী কীভাবে এমন সমান্তরাল সিন্ডিকেট চালালেন, কীভাবে তিনি হাজার কোটি টাকার মালিক হলেন এবং কার ইশারায় তার কঠোর শাস্তির বদলে নামমাত্র ‘তিরস্কার’ করে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা চলছে—তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

 

(আগামী পর্বে সমাপ্য: দ্বিতীয় পর্বে থাকছে তাবেদুন নবীর নামে-বেনামে থাকা অঢেল সম্পদ, বিদেশে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার ও তার দেশব্যাপী বিস্তৃত দুর্নীতির অদৃশ্য নেটওয়ার্কের চাঞ্চল্যকর তথ্য…)

প্রিন্ট করুন