দুর্নীতি আড়াল করতে ‘সাংবাদিক বাহিনী’! ইউপি সচিব আবুল কালাম আজাদের অবৈধ সম্পদের খোঁজে দুদক।
নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঢাকার সাভার উপজেলার আশুলিয়ার ধামসোনা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সচিব আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
সরকারি চাকরি করে নামমাত্র বেতনে কীভাবে তিনি বহুতল ভবন, মার্কেট ও বিপুল পরিমাণ জমির মালিক হলেন—তা নিয়ে স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও গুঞ্জন সৃষ্টি হয়েছে। ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জরুরি অনুসন্ধান ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ধামসোনা ইউনিয়ন পরিষদে কর্মরত থাকাকালীন সচিব আবুল কালাম আজাদকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদ, নাগরিক সনদ এবং ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা দেওয়ার নামে সরকারি নির্ধারিত অর্থ- চেয়ে কয়েক গুণ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হতো।
সবচেয়ে অমানবিক বিষয় হলো, সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতাধীন বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা ও প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অসহায় দরিদ্র মানুষের কাছ থেকেও মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হতো। টাকা না দিলে মাসের পর মাস ফাইল আটকে রাখা এবং আবেদনকারীদের হয়রানি করার অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এর ফলে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং সরকারের উন্নয়নমূলক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ধামসোনা ইউনিয়নে যোগদানের আগে আবুল কালাম আজাদ তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদে কর্মরত ছিলেন। সেখানে থাকাকালীন স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রভাব খাটাতেন তিনি। সেই রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি একের পর এক অপকর্ম চালিয়ে যান। বর্তমানে তিনি বনগাঁও ইউনিয়ন পরিষদে কর্মরত থাকলেও তার সিন্ডিকেটের দাপট কমেনি।
আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, নিজের দুর্নীতি আড়াল করতে তিনি নিজস্ব ‘পালিত’ একটি ভুঁইফোড় সাংবাদিক গ্রুপ গড়ে তুলেছেন। কোনো গণমাধ্যমকর্মী বা সাধারণ মানুষ তার দুর্নীতির তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে, এই পালিত বাহিনী দিয়ে বাধা দেওয়া হতো এবং নানা ধরনের হুমকি-ধমকি দিয়ে তথ্য সংগ্রহ বন্ধ করে দেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
একজন ইউনিয়ন পরিষদ সচিবের বর্তমান সরকারি বেতন স্কেল অনুযায়ী মাসিক মূল বেতন প্রায় ২৪ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু এই সামান্য আয়ের বিপরীতে আবুল কালাম আজাদের অর্জিত সম্পদের খতিয়ান চোখ কপালে তোলার মতো।
অভিযোগ অনুযায়ী, আশুলিয়ার কাটগড়া বাংলালিংক সড়ক এলাকায় তার নামে রয়েছে একটি বিশাল বহুতল ভবন ও বাণিজ্যিক মার্কেট। এছাড়াও সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মৌজায় নামে-বেনামে অসংখ্য জমি, প্লট ও আবাসিক ফ্ল্যাট রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। সামান্য বেতনের চাকরিজীবী হয়ে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সম্পদের মালিক কীভাবে হলেন—তা এখন এলাকার মানুষের মুখে মুখে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি কর্মচারী হয়ে আয়ের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ স্থাবর বা অস্থাবর সম্পদ অর্জন করা ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন, ২০০৪’ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অভিযোগের সত্যতা অনুসন্ধানে দুদকের এখনই মাঠে নামা প্রয়োজন। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী তার চাকরিচ্যুতি, কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড এবং অবৈধ উপায়ে অর্জিত সকল সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার স্পষ্ট বিধান রয়েছে।
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত ইউপি সচিব আবুল কালাম আজাদের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সদুত্তর বা বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে তাকে ফোন করা হলে তিনি এড়িয়ে যান।
এলাকাবাসী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং সেবা নিতে এসে প্রতারিত হওয়া সাধারণ মানুষ অবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ সচিবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় সরকার বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে একটি নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে তার অবৈধ সম্পদের উৎস খোঁজার দাবি তুলেছেন তারা। প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এই তদন্ত এখন সময়ের দাবি।



