জমি নিয়ে বিরোধ: মুরাদনগরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ সাবেক ইউপি সদস্যসহ হাসপাতালে ৫
কুমিল্লা প্রতিনিধি:
কুমিল্লার মুরাদনগরে জমি ও রাস্তার সীমানা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে বসতঘর ভাঙচুর, জমি দখল, মারধর, স্বর্ণালংকার ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়া এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ সরকারি উদ্যোগে রাস্তা পরিমাপের সময় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে সাবেক ইউপি সদস্য মোহাম্মদ নায়েব আলী, তাঁর মেয়ে তাছলিমা, মেয়ের জামাতা জামাল হোসেনসহ অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ২০ অক্টোবর মুরাদনগর থানায় এজাহার দায়ের করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ভুক্তভোগী পরিবার।
এজাহার ও ভুক্তভোগী পরিবারের সূত্রে জানা যায়, গত ১৮ অক্টোবর ২০২৬ দুপুরে উপজেলার দারোরা ইউনিয়নের কাজিয়াতল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নায়েব আলী ওই ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য। জমির মালিকানা ও সীমানা নিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে তাঁদের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। এ নিয়ে আদালতে মামলাও বিচারাধীন রয়েছে বলে পরিবারটি জানিয়েছে।
পরিবারের দাবি, বিরোধের সূত্রপাত ২০২৫ সালে। প্রতিবেশী আব্দুর রশীদকে কেন্দ্র করে কয়েকজন তাঁদের জমির মালিকানা নিয়ে আপত্তি তোলেন। তবে আব্দুর রশীদের সঙ্গে তাঁদের জমি নিয়ে কোনো বিরোধ ছিল না বলে দাবি পরিবারের সদস্যদের।তারা যানান, দীর্ঘদিন ধরে নিজ নিজ সীমানা অনুযায়ী তাঁরা জমি ভোগদখল করে আসছিলেন। স্থানীয়ভাবে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে ২০২৫ সালে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৫ ধারায় মামলা করা হয়।
পরিবারটির অভিযোগ, ওই বছরের ১৬/১২/২৫ সকালে প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁদের বাড়িতে প্রবেশ করে একটি চৌচালা টিনের ঘর, রান্নাঘর, গোয়ালঘর ও পাকা শৌচাগার ভাঙচুর করেন এবং প্রায় দুই শতক জমি দখলে নেন। এ সময় নায়েব আলীকে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় কুমিল্লার আদালতে দ্রুত বিচার আইনে ৪৪/২৫ নম্বর মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবারটি। জমি ফিরিয়ে দেওয়া ও ভাঙচুরের ক্ষতিপূরণের আশ্বাসে অভিযুক্তরা আপসের শর্তে জামিন পান বলে তাঁদের দাবি।
পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের ৫ মে তাঁদের আরও দুটি বাড়ি তারকাঁটা ও সিমেন্টের পিলার দিয়ে ঘিরে দখল করা হয় বলে অভিযোগ পরিবারের। বিষয়টি আদালতকে জানানোর পরও বিরোধের নিষ্পত্তি হয়নি। পরে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উদ্যোগে সালিশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে সাবেক ও বর্তমান চেয়ারম্যান, উভয় পক্ষের সার্ভেয়ারসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। জমির কাগজপত্র পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত দেওয়া হলেও প্রতিপক্ষ পরে তা মানেনি বলে দাবি পরিবারটির। পাশাপাশি মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তাঁরা।
সর্বশেষ গত ১৮ অক্টোবর বিরোধপূর্ণ রাস্তা পরিমাপের উদ্যোগ নেওয়া হলে পরিস্থিতির আবারও অবনতি ঘটে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ভূমি কার্যালয়ের তহসিলদার ও সার্ভেয়ার ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। এ সময় দুই সাংবাদিক ও স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তিও সেখানে ছিলেন। রাস্তা পরিমাপকে কেন্দ্র করে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে তাঁদের ওপর হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ, শাহজাহান নামের এক ব্যক্তি শাবল দিয়ে নায়েব আলীর মাথায় আঘাতের চেষ্টা করেন। তিনি মাথা সরিয়ে নিলে আঘাতটি তাঁর মুখে লাগে। এতে তিনি গুরুতর জখম হন এবং একটি দাঁত পড়ে যায়। পরে মিজান মুন্সী তাঁর গলা চেপে ধরে মুখে ঘুষি মারলে আরও একটি দাঁত পড়ে যায় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাবাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে নায়েব আলীর মেয়ে তাছলিমাকে মাটিতে ফেলে চুল ধরে টানাহেঁচড়া ও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ পরিবারের। এ সময় তাঁর গলায় থাকা প্রায় এক ভরি চার আনা ওজনের একটি সোনার চেইন ও একটি মুঠোফোন নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। তাছলিমার স্বামী জামাল হোসেন স্ত্রীকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে কামাল হোসেন পিন্টু ধারালো ছুরি দিয়ে তাঁর পিঠে আঘাত করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরিবারের অন্য সদস্যরাও মারধরের শিকার হন বলে দাবি করা হয়েছে।
পরে স্থানীয় লোকজন আহতদের উদ্ধার করে মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর নায়েব আলীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুমিল্লার কুচাইতলী হাসপাতালে পাঠানো হয় বলে জানিয়েছে পরিবার। চিকিৎসা নেওয়ার পর ২০ অক্টোবর তিনি মুরাদনগর থানায় এ ঘটনায় এজাহার দায়ের করেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিনের জমিসংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে তাঁদের বসতভিটা ও জমি দখলের চেষ্টা, ঘরবাড়ি ভাঙচুর, হামলা এবং মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, জমি ও বসতভিটার অধিকার ফিরে পাওয়া এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।



