যুক্তরাষ্ট্রেই সরকার পরিবর্তন ঘটিয়েছে ইরান’: মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের পর কঠিন সমীকরণে ট্রাম্প
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর ইরান সংঘাত নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক ও সামরিক সংকটের মুখে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আট মাস আগে ইরানে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু করলেও, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট ও মূল্যস্ফীতির জেরে উল্টো ওয়াশিংটনেই রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেছে।
কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়া ট্রাম্পের সামনে এখন যুদ্ধ অবসানে প্রধানত তিনটি পথ খোলা রয়েছে—তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতা, সীমিত পরিসরে সুনির্দিষ্ট সামরিক হামলা, অথবা দীর্ঘমেয়াদি নৌ অবরোধ ও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাতে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি দেশের সংশ্লিষ্ট এক মার্কিন কর্মকর্তা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে মন্তব্য করেন, ‘ইরানে শাসনব্যবস্থা বদলাতে গিয়ে প্রকারান্তরে যুক্তরাষ্ট্রেই সরকার পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে ইরান।’ মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের এমন একতরফা বিজয়ে উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলোও বিস্মিত হয়েছে বলে জানান তিনি।
যুদ্ধের সূচনা ও বৈশ্বিক প্রভাব
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানের মাধ্যমে ইরান যুদ্ধ শুরু হয়। জবাবে ইরান উপসাগরীয় বিভিন্ন কৌশলগত স্থাপনা ও হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে মার্কিন অর্থনীতি ও ভোটারদের ওপর। সামরিক অভিযানে ইরানের অবকাঠামোর বড় ক্ষতি হলেও দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব হয়নি।
কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ট্রাম্পের সামরিক সিদ্ধান্তের ওপর আইনি ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে, পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান চালানোর সক্ষমতা ও আগ্রহ এখন ওয়াশিংটনের কমে গেছে। ফলে নিজেদের রক্ষা করতে পরমাণু স্থাপনায় প্রতীকী বা সীমিত হামলা চালিয়ে বিজয় দাবি করার চেষ্টা করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে যুদ্ধবিরতির জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে চীন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এমন কোনো একতরফা চুক্তি হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ—যা ইরানকে বিজয়ী এবং ট্রাম্পকে পরাজিত হিসেবে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরবে।
নতুন সামরিক পদক্ষেপের ঝুঁকি
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, মধ্যবর্তী নির্বাচন পার হয়ে যাওয়ায় এবং তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার সাংবিধানিক সুযোগ না থাকায় ট্রাম্পের ওপর নির্বাচনি চাপ কমেছে। সৌদি আরবভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ সাগেরের মতে, ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তি রক্ষা করতে ট্রাম্প বরং আরও আক্রমণাত্মক হতে পারেন। ইরান যদি সংঘাতকে নিজেদের বিজয় হিসেবে প্রচার করতে থাকে, তবে ট্রাম্প কঠোর সামরিক প্রত্যুত্তর বেছে নিতে পারেন।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ সংকট ও ভুল হিসাবের শঙ্কা
সংঘাতের আরেক পক্ষ ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও টালমাটাল। গত ২৭ অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থি জোট ১২০ আসনের নেসেটে মাত্র ৫৩টি আসন পেয়েছে, যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে আটটি কম। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু—উভয় নেতাই এখন নিজ দেশে রাজনৈতিক অস্তিত্ব সংকটে থাকায় দৃষ্টি ঘোরাতে সংঘাতের পরিধি আরও বাড়াতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
আবুধাবিভিত্তিক এমিরেটস পলিসি সেন্টারের প্রেসিডেন্ট এবতেসাম আল-কেতবি সতর্ক করে জানান, ওয়াশিংটনের সমঝোতার তাড়াহুড়োকে যদি তেহরান মার্কিন ‘দুর্বলতা’ হিসেবে দেখে আপসহীন অবস্থান নেয়, তবে সংঘাত অনিয়ন্ত্রিত রূপ নিতে পারে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অবাধ নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোনো সাময়িক যুদ্ধবিরতি দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় বিপর্যয়ের জন্ম দেবে।
তেহরানের সর্বোচ্চ সতর্কতা
নির্বাচনের ফলাফলে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সংকটে স্বস্তি দেখা গেলেও সতর্কতা কমায়নি তেহরান। নির্বাচনের রায়কে ‘যুদ্ধের বিরুদ্ধে রায়’ আখ্যা দিয়ে ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরাজয়ের গ্লানি ঢাকতে ট্রাম্প আকস্মিক হামলা চালাতে পারেন—এমন আশঙ্কায় তাদের বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, চাপের মুখে হরমুজ প্রণালি বা সামরিক নীতিতে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
সব মিলিয়ে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সমীকরণকে পুরোপুরি বদলে দিলেও এটি দ্রুত শান্তি আনবে, নাকি দুই পক্ষের ভুল বোঝাবুঝির কারণে নতুন কোনো বিধ্বংসী সামরিক সংঘাতের সূচনা করবে—তা এখনো অনিশ্চিত।




