আওয়ামী পৃষ্ঠপোষকতায় গণপূর্তে তামজিদ সিন্ডিকেট: এক দশকেও ভাঙেনি দুর্নীতির জাল।
গণপূর্ত ই/এম৫ এর নির্বাহী প্রকৌশলী তামজিদ হোসেন আওয়ামী পৃষ্ঠপোষকতায় ২০১৩ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরে যোগদান করেন। একটি বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছেন। চাকরির শুরু থেকে আওয়ামী রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভোল পাল্টে সুযোগ সুবিধা নিচ্ছেন।
ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগ-৫-এর একটি সরকারি টেন্ডার মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করার পরও একটি যৌথ উদ্যোগ (JV) প্রতিষ্ঠানকে অন্যায়ভাবে ‘নন-রেসপনসিভ’ (অযোগ্য) ঘোষণা করে অন্য একটি সংস্থাকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী তামজিদ হোসেনের বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ‘Baset Prokousholi Limited-Versatile Technology Ltd JV’ নামের একটি যৌথ প্রতিষ্ঠান উক্ত টেন্ডারে অংশ নেয়। প্রতিষ্ঠানের আইনজীবীদের দাবি, টেন্ডারের শর্ত মোতাবেক প্রয়োজনীয় সমজাতীয় কাজের অভিজ্ঞতা (Similar Nature Work Experience), সমাপ্তি সনদ (Completion Certificate) এবং কাজের পরিধি (Scope of Work) সংক্রান্ত সব বৈধ কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল। টেন্ডার নথিতে নির্দিষ্ট কোনো প্রকল্পের নাম নয়, বরং কাজের ধরন ও কারিগরি জটিলতার সামঞ্জস্যতা চাওয়া হয়েছিল।
অভিযোগ রয়েছে, উক্ত যৌথ প্রতিষ্ঠানটি এর আগে একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম প্রকল্পে ইন্টারনাল ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার্কস, স্টেজ লাইটিং, সাউন্ড সিস্টেম, এলইডি ডিসপ্লে, এয়ার কন্ডিশনিং এবং অ্যাকোস্টিক ওয়ার্কসের মতো অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তিগত কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। কিন্তু মূল্যায়ন কমিটি রহস্যজনকভাবে সেই অভিজ্ঞতাকে আমলে না নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে অযোগ্য ঘোষণা করে এবং অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ‘Notification of Award (NOA)’ বা কার্যাদেশ জারির নোটিশ দেয়।
এই অনিয়মের প্রতিবাদে বঞ্চিত প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. সাজ্জাদ হোসেন পলাশ গত ২৮ জুন ২০২৬ তারিখে নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর একটি আইনি নোটিশ পাঠান।
নোটিশে বলা হয়, এই ধরনের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সরকারি ক্রয়বিধির (PPR) স্বচ্ছতা, সমতা ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার নীতির পরিপন্থী। নোটিশে অবিলম্বে ৩টি দাবি জানানো হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটিকে ‘নন-রেসপনসিভ’ ঘোষণার সুনির্দিষ্ট কারণ লিখিতভাবে জানাতে হবে।
জমাকৃত অভিজ্ঞতার সনদসমূহ পুনরায় নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
তড়িঘড়ি করে জারি করা NOA-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে। একই সাথে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যথাযথ ও সন্তোষজনক পদক্ষেপ না নেওয়া হলে বিষয়টি
প্যানেল এবং উচ্চ আদালতে নিয়ে যাওয়া হবে।
আইনি নোটিশে শুধু বর্তমান টেন্ডারই নয়, বরং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নির্বাহী প্রকৌশলী তামজীদ হোসেনের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়িত একাধিক উচ্চমূল্যের প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। নোটিশে সুনির্দিষ্টভাবে তিনটি বড় প্রকল্পের আর্থিক অনিয়মের খতিয়ান তুলে ধরা হয়:
শাহবাগ বিসিএস প্রশাসন একাডেমি প্রকল্প (টেন্ডার আইডি-১১০৯৩০১): প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ ৩২ হাজার টাকা ব্যয়ে আধুনিক ক্লাসরুম নির্মাণ, সাউন্ড, কনফারেন্স ও ইন্টারনেট সিস্টেম স্থাপন।
কাকরাইল বিএমইটি ভবন প্রকল্প (টেন্ডার আইডি-১০৮১৮১০): প্রায় ৮৯ লাখ ৩৬ হাজার ৯০৩ টাকা ব্যয়ে ৫০০ কেভিএ সাবস্টেশন প্রতিস্থাপন।
জিএসবি ভবন প্রকল্প (টেন্ডার আইডি-১০৭২১৪৫৮): প্রায় ১ কোটি ৫১ লাখ ৯০ হাজার টাকা ব্যয়ে ১২৫০ কেভিএ সাবস্টেশন স্থাপন।
নোটিশে অভিযোগ করা হয়, এসব প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়ন ও কার্যাদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার ন্যূনতম পরিবেশ বজায় রাখা হয়নি। বিশেষ করে লিমিটেড টেন্ডারিং মেথড (LTM)-এর অপব্যবহার করে অনেক ক্ষেত্রে মাত্র একটি সিডিউল বিক্রি ও একটি মাত্র দরপত্র জমা নিয়েই তড়িঘডি
করে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের একতরফা প্রক্রিয়া সরকারি ক্রয়ের প্রতিযোগিতামূলক এবং উন্মুক্ত নীতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক বলে নোটিশে দাবি করা হয়।
এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে গণপূর্ত ই/এম৫ এর নির্বাহী প্রকৌশলী তামজিদ হোসেনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।বক্তব্য পাওয়া গেলে পরবর্তী সংখ্যায় প্রকাশ করা হবে।



