গৃহায়ণে তাবেদুন সিন্ডিকেটের লুটপাট (৩য় পর্ব)
নিজস্ব প্রতিবেদক:
দ্বিতীয় পর্বে উন্মোচিত হয়েছিল মিরপুরকেন্দ্রিক দুর্নীতির বিস্তৃত জাল, যেখানে নির্বাহী প্রকৌশলী জোয়ারদার তাবেদুন নবী গড়ে তুলেছিলেন একটি ‘প্যারালাল প্রশাসন’। তৃতীয় পর্বের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আরও গভীর ও বিস্তৃত সেই অন্ধকার নেটওয়ার্ক যেখানে শুধু একটি প্রকল্প নয়, বরং একাধিক সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পকে ব্যবহার করা হয়েছে ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে।
নথিপত্র বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, তাবেদুন নবীর প্রভাব বলয় ছড়িয়ে ছিল রাজধানীর বাইরেও। বিশেষ করে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের অধীনে চলমান কয়েকটি আবাসন প্রকল্পে একই ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করা গেছে। জমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে প্লট বরাদ্দ, ঠিকাদারি নিয়োগ, এমনকি নির্মাণ সামগ্রীর মান নির্ধারণ সবকিছুতেই ছিল একটি সুসংগঠিত ‘কমিশন বাণিজ্য’।
অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দিতে দরপত্র প্রক্রিয়াকে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রভাবিত করা হতো। টেন্ডার ডকুমেন্ট এমনভাবে সাজানো হতো যাতে ‘পছন্দের’ প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কেউ যোগ্যতা অর্জন করতে না পারে। এর বিনিময়ে কোটি কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদার, যারা পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক।
এই সিন্ডিকেটের আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো ‘ফাইল বাণিজ্য’। একটি ফাইল সচল রাখা, অনুমোদন দেওয়া কিংবা আটকে রাখার জন্য নির্ধারিত ছিল আলাদা আলাদা রেট। অভিযোগ রয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ঘুষ দিতে ব্যর্থ হলে তাদের প্রকল্প ফাইল বছরের পর বছর ঝুলে থাকত, অথচ একই সময়ে ঘুষ প্রদানকারীদের ফাইল অস্বাভাবিক দ্রুততায় অনুমোদন পেত।
তদন্তে উঠে এসেছে, তাবেদুন নবীর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা এবং দালাল শ্রেণির মধ্যস্থতাকারী এই পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করতেন। তারা সরাসরি অর্থ লেনদেন না করলেও ‘বিশ্বস্ত চ্যানেল’ হিসেবে কাজ করতেন। নগদ টাকা, মোবাইল ব্যাংকিং এবং বিদেশে অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে হুন্ডি ব্যবস্থার ব্যবহার ছিল নিয়মিত।
আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত ছিল কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ আমলা, যারা নেপথ্যে থেকে তাবেদুন নবীকে ‘সুরক্ষা বলয়’ প্রদান করতেন। ফলে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো বারবার তদন্তের আগেই চাপা পড়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকাও দীর্ঘ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা আবাসন প্রকল্পে বিনিয়োগ করে প্রতারিত হয়েছেন হাজারো মধ্যবিত্ত পরিবার। কেউ জমির কাগজ পাচ্ছেন না, কেউ আবার নির্মাণ কাজ শেষ না হওয়ায় বছরের পর বছর ভাড়া বাসায় থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রেখে বিনিয়োগ করলেও শেষ পর্যন্ত তারা পড়েছেন এক দুর্নীতির ফাঁদে।
তৃতীয় পর্বের অনুসন্ধান বলছে, তাবেদুন সিন্ডিকেটের এই নেটওয়ার্ক এখনও সক্রিয়, এবং প্রভাব বিস্তার করছে নতুন নতুন প্রকল্পে।
চলবে…




