সাঈদুর রহমান রিমন এর মৃত্যু কি সত্যিই স্বাভাবিক? নাকি পরিকল্পিত
সুপরিকল্পিত একটি হত্যাকাণ্ড? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে, একটি কঠিন ও চিকিৎসা-ভিত্তিক বাস্তবতা সামনে আনা জরুরি- মদ্যপানরত কাউকে হাঁটু পানিতেও হত্যা করা সম্ভব। হ্যাঁ, একেবারে হাঁটু পানি। ফরেনসিক বিজ্ঞানের ভাষায়, এ হলো “Low-Force Drowning Technique”- যেখানে প্রচণ্ড আঘাত কিংবা রক্তপাতের প্রয়োজন পড়ে না, কেবল পরিকল্পনা, অবস্থান এবং সময়ের সুযোগই যথেষ্ট।
একজন মানুষ যখন অতিরিক্ত মদ্যপানে চেতনা হারানোর পথে থাকে, তখন তার শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, স্বতঃস্ফূর্ত হাত-পা নাড়া কিংবা মুখ ওপরে রাখার সামর্থ্য নষ্ট হয়ে যায়। অচেতন, অর্ধ-চেতন বা ভারসাম্যহীন কাউকে হাঁটু বা কোমর পানি পর্যন্ত নামিয়ে শুধু সামান্য ধাক্কা দিয়ে অথবা চেপে ধরে শ্বাসরোধ ঘটিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া যায়। এটাই বাস্তবতা, এটাই সত্য। এবং এটি কোনো সিনেমার গল্প নয়- বরং বহু দেশে ঘটে যাওয়া ফরেনসিকভাবে প্রমাণিত হত্যা কৌশল।
সাঈদুর রহমান রিমন ভাইকে ঘিরে ক্রমেই প্রশ্ন আর সন্দেহ জোরালো হচ্ছে। গাজীপুরের প্রভাবশালী ‘আলম’ নামের একাধিকবার হুমকিদাতা ব্যক্তির বাড়ির পাশের রিসোর্টে রিমন ভাই কেন গেলেন? কে নিয়ে গেলেন? কার সঙ্গে গেলেন? এবং সেখানে আগের রাতে থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত তাকে মদ্যপান করানো হলো- এই ঘটনাগুলো একসাথে বিশ্লেষণ করলে দৃশ্যপটে একটা পরিকল্পিত ফাঁদ কিংবা হত্যার ছক পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে।
একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য অনুযায়ী, সেই রিসোর্টে রাতভর মদ্যপানের পর রিমন ভাইকে সুইমপুলে নামানো হয়। এরপরই বুকব্যথা, দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া এবং মৃত্যু- সবকিছু যেন একটি সাজানো নাটকের পর পর দৃশ্য। আশঙ্কাজনকভাবে ময়নাতদন্ত ছাড়াই তড়িঘড়ি দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অথচ তার কপালে আঘাতের দাগ এবং পা হলুদ হয়ে যাওয়া- এই দুইটি বিষয়ই স্বাভাবিক মৃত্যুকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
যাদের সঙ্গে রিমন ভাই থাকলেন, তাদের সঙ্গে তার অতীতে ছিল সংঘাতপূর্ণ সম্পর্ক। সাংবাদিক সরকার জামাল, যিনি মাদক ও নারী কেলেঙ্কারির ঘটনায় রিমনের রিপোর্টের পর জেল খেটেছেন, তিনি কীভাবে আবার ঘনিষ্ঠ হলেন? সাংবাদিক শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে যার বহুদিন দ্বন্দ্ব চলছিল, তিনি কিভাবে এই সফরের সঙ্গী হলেন? আর বাংলার ভূমি পত্রিকার সেই আলোচিত সম্পাদক, যিনি বহুবার রিমন ভাইয়ের চরিত্র হননে ভূমিকা রেখেছেন, তিনিও কেন এই সমাবেশে?
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, হাসপাতালে উপস্থিত সাংবাদিকদের আচরণকে রহস্যজনক বলে বর্ণনা করেছেন একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী। ঘটনাস্থলে থাকা কারো কারো বয়ানে অস্বাভাবিকতা স্পষ্ট, যেন কেউ মুখস্থ স্ক্রিপ্ট পড়ছে।
এখন প্রশ্ন হলো- একজন সাহসী, সৎ ও নির্ভীক সাংবাদিক যিনি নিজের জীবন দিয়ে সত্যের পক্ষে লড়েছেন, তার মৃত্যুকে আমরা কত সহজে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নিচ্ছি? ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন, পরিকল্পিত মদ্যপান, শত্রুদের সঙ্গে অবস্থান, আঘাতের চিহ্ন- এসব কি আমরা এড়িয়ে যাব?
লেখক:
মাইনুল ইসলাম মহিন
সম্পাদক ও প্রকাশক
দৈনিক ভোরের নতুন বার্তা




