ছায়া প্রভু’ তুহিনের দুর্বৃত্ত সাম্রাজ্য রাজনীতি, পর্ব-৩
নিজস্ব প্রতিবেদক:
দিনাজপুর-৪ (খানসামা-চিরিরবন্দর) আসনে এখন আর রাজনীতি নেই, নেই কোনো আদর্শ কিংবা দলের প্রকৃত কার্যক্রম—আছে শুধু এক ব্যক্তির একচ্ছত্র দাপট। নাম রবিউল ইসলাম তুহিন। বিএনপির উপজেলা মহাসচিব পরিচয়ে থাকলেও, বাস্তবে তিনিই এখানে ছায়া শাসক। তিনি এখন রাজনীতির ছদ্মবেশে একটি ভয়াবহ দুর্বৃত্ততন্ত্রের রাজত্ব কায়েম করেছেন—যেখানে প্রশাসন, পুলিশ, ঠিকাদারি, এমনকি মাদক সিন্ডিকেটও তার ‘নির্দেশনা’ মেনে চলে।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে—উপজেলা প্রশাসনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে তুহিনের অনুমতি না হলে ফাইল নড়ে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র কর্মকর্তা জানান, উনার (তুহিনের) সম্মতি ছাড়া এখন অনেক কাজই আটকে থাকে। প্রকাশ্যে কেউ স্বীকার করে না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সবাই জানে।
ভূমি অফিস, শিক্ষা অফিস, পুলিশ প্রশাসন—সবখানে রয়েছে তার প্রভাব। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও নীরব দর্শক।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, তুহিন গড়ে তুলেছেন একটি ছায়া গোয়েন্দা চক্র, যারা দলীয় নেতা-কর্মী, সাংবাদিক, এমনকি প্রশাসনের উচ্চপদস্থদের গতিবিধিও নজরদারিতে রাখে। এই নেটওয়ার্কটি মূলত তাকে আগাম তথ্য সরবরাহ এবং সম্ভাব্য বিরোধীদের নিঃশেষ করে দিতে সহায়তা করে।
খানসামা ও চিরিরবন্দরে পাঁচটি গোপন গুদামে নিয়মিতভাবে সরবরাহ হয় ইয়াবা, ফেন্সিডিল ও গাঁজা। একটি মাদকের চালান ধরা পড়ার পরে মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে ‘উর্ধ্বতন যোগাযোগে’ ছাড়িয়ে নেওয়ার উদাহরণ দিয়েছে একাধিক সুত্র। এক যুবক জানায়, যারা মাদকের বড় খেলা চালায়, তারা সবাই ওনার লোক। নাম শুনলেই থানা নরম হয়ে যায়।
তুহিনের ঘনিষ্ঠদের নামে নিবন্ধিত ৪টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হাতে রয়েছে অধিকাংশ উন্নয়ন প্রকল্প। নিয়ম খুব স্পষ্ট—৩০% আগাম না দিলে কোনো কাজের টেন্ডার পর্যন্ত দেখা যাবে না। দিনাজপুর জেলা পরিষদের এক কর্মচারী বলেন, কাজের মান? সেটা বড় কথা না। টাকা যাদের দেওয়া লাগে, তাদের ঠিক থাকলেই বিল হয়।
অভিযোগ আছে, কিছু প্রকল্পে রাস্তা না করেই বিল তোলা হয়েছে। মানহীন কাজের মাধ্যমে সরকারের কোটি কোটি টাকা লুট করা হয়েছে।
রংপুর, দিনাজপুর ও সৈয়দপুরে গড়ে তুলেছেন বিলাসবহুল তিনটি বাসা ও একাধিক গোপন হোস্টেল। সেখানেই হয় টেন্ডার ভাগাভাগি, মাসোয়ারা চুক্তি ও প্রশাসনিক ম্যানেজিং। এসব বাসায় রয়েছে দামি আসবাবপত্র, গাড়ি এবং ভিডিও নজরদারির ব্যবস্থা।
যদিও তিনি বিএনপির নেতা, কিন্তু আওয়ামী লীগের কিছু স্থানীয় দুর্বল নেতাদের ব্যবহার করে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব ছায়া আওয়ামী লীগ। যার কাজ শুধু আসল আওয়ামী লীগকে মাঠছাড়া রাখা। এক নেতা আক্ষেপ করে বলেন, আমরা এখন আওয়ামী লীগ করলেও মাঠে যেতে পারি না। কারণ সেখানেও ওনার লোক বসে আছে।
এই প্রতিবেদনের তথ্য জানতে ফোন করা হলে, তুহিন প্রতিবেদককে সরাসরি হুমকি দেন। বলেন, এসব রিপোর্ট করলে মামলা তো হবেই, আরও খারাপ কিছু হতে পারে। প্রতিবেদকের নিরাপত্তার স্বার্থে ঢাকায় থানায় জিডি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে আরও কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিক জানিয়েছেন—তাদেরও নজরদারির মধ্যে রাখা হচ্ছে।
বিএনপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, এমন চরিত্রদার ব্যক্তি আমাদের দলে থাকার যোগ্য নয়। তদন্তের পর প্রমাণিত হলে আমরা তাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিতে পারি।
রবিউল ইসলাম তুহিনের উত্থান কেবল তার কৌশলেই নয়, রাজনৈতিক দুর্বলতা ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায়ও হয়েছে সম্ভব। তাকে থামানো না গেলে এই এলাকা রাজনীতির নামে দুর্বৃত্ততন্ত্রের সন্ত্রাসে ডুবে যাবে।
সাধারণ মানুষ এখন একটাই প্রশ্ন করছেন—আমরা আর কতকাল ভয় নিয়ে বাঁচবো?
এতদিন যারা পাশে দাঁড়ায়নি, আজ তার দয়া প্রার্থনা করছে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—দানবদের চেয়ে বড় হয় না জনগণ। সময় এসেছে প্রশ্ন তোলার, সময় এসেছে প্রতিরোধের।
চলবে…




